সংক্রমণ ক্ষমতা বাড়ছে, কমছে জটিলতা

প্রায় বছরজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারীর ধাক্কায় নাজেহাল পুরো বিশ্ব। এই সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় করোনাভাইরাস সম্পর্কে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বর্তমানে দেশে ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে মানুষকে সংক্রমিত করার ক্ষমতা বেড়েছে করোনাভাইরাসের। তবে কমেছে শরীরে জটিলতা সৃষ্টি করার ক্ষমতা। এতে আক্রান্ত বাড়লেও মৃত্যুঝুঁকি কমবে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) এক দল গবেষকের তত্ত্বাবধানে এই গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। তারা করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সার্স কোভি-২ এর জিনোম সিকুয়েন্স বিভিন্ন বায়োইনফরমেটিক্স টুলের সাহায্যে বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা।

গবেষক দলের সদস্য যবিপ্রবির অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অভিনু কিবরিয়া ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এ গবেষণায় আমরা দেখিয়েছি যে ভাইরাসের জিনোমে কিছু মিউটেশন বা পরিবর্তন বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রাধান্য বিস্তার করছে। একই সঙ্গে ঘটা চারটি গুরুত্বপূর্ণ মিউটেশন, যাদের আমরা কো-ইভলভিং মিউটেশন বলছি, তারা যেসব ভাইরাসে আছে, তাদের জি ক্ল্যাড ভাইরাস বলছি। জি ক্ল্যাড ভাইরাসের মিউটেশনগুলোর সঙ্গে যদি ভাইরাসের ওআরএফ-৩এ প্রোটিনে আরেকটি মিউটেশন থাকে, তাকে বলা হয় জিএইচ ক্ল্যাড। আবার জি ক্ল্যাডের মিউটেশনগুলোর সঙ্গে ভাইরাসের নিউক্লিওক্যাপসিড  প্রোটিনের নির্দিষ্ট স্থানে যদি ডাবল মিউটেশন থাকে, তাদের বলা হচ্ছে জিআর ক্ল্যাড। বর্তমানে যে ভাইরাসগুলো পাওয়া যাচ্ছে তাদের ৯০ ভাগেরও বেশি জি, জিএইচ বা জিআর ক্ল্যাডের ভাইরাস। সংক্রমণের শুরুতে যে এস ক্ল্যাড বা ভি ক্ল্যাডের ভাইরাস পাওয়া যেত তা এখন খুব কম পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী জিআর ক্ল্যাডের ভাইরাসের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমণের সংখ্যা বেড়েছে, অথচ মৃত্যুহার বা রোগের তীব্রতা কমেছে। উপসর্গহীন রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। এ বিষয়গুলো কেন ঘটছে, বা ভাইরাসের এই মিউটেশনগুলো ভাইরাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনগুলোর ওপর কী প্রভাব ফেলছে তা আমরা ব্যাখ্যা করেছি। ভাইরাসের বিবর্তনের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনগুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করছে এবং তা দ্রুতই সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারছে। এ ভাইরাসগুলোর মধ্যে একসঙ্গে কয়েকটি মিউটেশন সহ-বিবর্তিত হওয়ায় মিউটেশনগুলো একে অপরের সম্পূরক হিসেবে কাজ করছে। ভাইরাসের সংক্রমণকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। আবার কোনো কোনো মিউটেশনের কারণে ভাইরাস মানুষের দেহের ইমিউনো রেসপন্সকে (ইমিউনো প্রক্রিয়া) উপেক্ষা করার সক্ষমতা অর্জন করায় তা অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গ সৃষ্টি করছে না কিংবা কম উপসর্গ সৃষ্টি করছে। উপসর্গ কম থাকায় আক্রান্ত মানুষ অন্য সুস্থ মানুষের সংস্পর্শে আসছে ও ভাইরাস ছড়াচ্ছে। এভাবে রোগের তীব্রতা না বাড়িয়েও ভাইরাসটি নিজেকে সংক্রমণশীল অবস্থায় টিকিয়ে রেখেছে। আমাদের গবেষণা পত্রটি ‘ইভলভিং ইনফেকশন প্যারাডক্স অব সার্স কোভি-২ ফিটনেস কসটস ভাইরুলেন্স’ শিরোনামে একটি জার্নালে পাঠানো হয়েছে। যা এখন রিভিউ পর্যায়ে আছে।

যবিপ্রবির উপাচার্য ও অণুজীব বিজ্ঞানী ড. মো. আনোয়ার হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা কিছু ভাইরাসের জিনোম সিকুয়েন্সিং করেছি, যা ইতিমধ্যে জিআইএসএআইডি ডাটাবেজে প্রকাশিত হয়েছে। কভিড সংক্রমণ হলে তার সঙ্গে অন্য কোনো ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঘটনা বেড়ে যায় কিনা সেটাও আমরা গবেষণা করছি। জিনোম সিকুয়েন্সিং ব্যয়বহুল হওয়ায় আমরা ভাইরাসের বিভিন্ন গোত্রকে সহজে চিহ্নিত করতে একটি মাল্টিপ্লেক্স পিসিআর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছি। কম খরচে কভিড শনাক্তকরণের কিট তৈরি করা, আমাদের দেশে টাকার মধ্যে ভাইরাস কতক্ষণ টিকে থাকতে পারে, আক্রান্ত রোগীর ভিতরে কী ধরনের ইমিউনো রেসপন্স তৈরি হচ্ছে এ ধরনের গবেষণাও আমরা চালিয়ে যাচ্ছি।

 

Source link

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here