মাদককেন্দ্রিক ‘কিশোর গ্যাং’ দিন দিন বেড়েই চলেছে ময়মনসিংহে main ছবি: বাংলা নিউজ ২৪
ছবি: বাংলা নিউজ ২৪

হত্যা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি বা চাঁদাবাজি নানা রকম নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে কিশোরদের সম্পৃক্ত হওয়ার খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লেও এক্ষেত্রে বেশ ব্যতিক্রম জেলা ময়মনসিংহ। এখানে তুলনামূলকভাবে এমন অপরাধ কম ঘটলেও এলাকাভিত্তিক মাদককেন্দ্রিক ‘গ্যাং কালচার’ রীতিমতো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

 

জেলা সদর ও মহানগরে এরকম প্রায় শতাধিক ‘কিশোর গ্যাং’ সক্রিয় রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় দিন দিন এরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এসব গ্যাংয়ে এলাকাভিত্তিক একজন ‘বড় ভাই’ বা ‘ভাই’ রয়েছেন।

মূলত এসব ভাইরাই নিজেদের আখের গোছাতে রাজনীতির নাম করে ‘কর্মী বলয়’ গড়ে তোলার আড়ালে এসব কিশোরদের মাদক পরিবহনে ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করে।

নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদেরই নিজেদের কব্জায় নিয়ে মাদক বিপণনের কাজে নামিয়ে দেয়। এদের প্রত্যেকের বয়স ১৪-২০ বছরের মধ্যে। নিজেদের স্বার্থেই এদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ছুরি-চাকু থেকে শুরু করে দেশীয় অস্ত্র। মারামারির ঘটনাও ঘটায় প্রকাশ্যেই। এসব ‘কিশোর গ্যাং’ এর প্রতিটি সদস্যই ইয়াবা আসক্ত।

মাদক সেবন করে ফূর্তির নাম করে হর্ন বাজিয়ে প্রচণ্ড গতিতে সড়কে মোটরসাইকেল চালানো এবং নারীদের উত্ত্যক্ত করাই নিজেদের রেওয়াজে পরিণত করেছে। যদিও ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) ফজলে রাব্বী বাংলানিউজের কাছে দাবি করেন, ‘হিরোইজমের মধ্যে দিয়ে ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার প্রবণতা ময়মনসিংহে এখনও গড়ে উঠেনি। ঐক্যবদ্ধভাবে বড় রকমের কোনো কিশোর অপরাধের ঘটনা এখানে ঘটেনি।

মাদককেন্দ্রিক ‘কিশোর গ্যাং’ দিন দিন বেড়েই চলেছে ময়মনসিংহে ছবি: বাংলা নিউজ ২৪
ছবি: বাংলা নিউজ ২৪

এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, গত ৬ মাসে ময়মনসিংহ জেলায় ৪৬টি মামলায় ৪৭ জন কিশোরের বিরুদ্ধে দোষীপত্র (অভিযোগপত্র) দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতনের ১২টি মামলায় ১৩ জন ইতোমধ্যেই জামিনে রয়েছেন। অন্য ৩৪টি মামলায় ৩৩ জন জামিনে রয়েছেন। বাকিরা সংশোধানাগারে রয়েছেন।

জানা যায়, ময়মনসিংহে ‘কিশোর গ্যাং’ দ্বারা সংগঠিত খুনের ঘটনা ময়মনসিংহে তুলনামূলকভাবে অনেক কম। প্রায় ৫ মাস আগে প্রকাশ্যে সিগারেট খাওয়াকে কেন্দ্র করে কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম খান (২৫) ও স্থানীয় বখাটে আশিকের (২০) মধ্যে বাদানুবাদের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই মাদকাসক্ত বখাটে আশিক শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলামের মেসে গত পহেলা মে মোবাইল ফোন চুরি করার পরিকল্পনা করে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে তৌহিদুল তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। তখন তৌহিদুলকে রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করে আশিক। এ হত্যাকাণ্ডের দু’দিনের মাথায় নগরীর আকুয়া বোডঘর এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

আরও জানা যায়, ‘গ্যাং কালচারে’ জড়িত কিশোররা চুরি-ছিনতাই বা ধর্ষণের মতো অপরাধ পেছনে ফেলে মাদক কারবারের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে নিজেদের জড়াচ্ছে।

স্থানীয় এলাকার লোকজন তাদের মাদক সেবনকারী ও খুচরা বিক্রেতা হিসেবেই চিনেন। স্থানীয় এলাকাবাসী তাদের তাণ্ডবে অতিষ্ঠ।

নগরীর নতুন বাজার, গাঙ্গিনারপাড়, চরপাড়া মোড়, মাসকান্দা, ব্রিজ মোড়, শম্ভুগঞ্জ, আকুয়া, কেওয়াটখালী, বাকৃবি এলাকা, কৃষ্টপুর, পুরোহিতপাড়া, বাঘমারাসহ আরও কমপক্ষে অর্ধ শতাধিক এলাকায় এক বা একাধিক এমন ‘গ্যাং’ রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে রয়েছেন এলাকাভিত্তিক ‘বড় ভাই’ বা ‘ভাই’।

সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন রাজনীতির ফ্রন্ট গিয়ারে থাকা পক্ষের ‘ঘেটু’ হিসেবেই এসব নিয়ন্ত্রকরা কাজ করেন। এ চক্রের কিশোরদের দারিদ্র্যতার সুযোগ নিয়ে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের দলে টানে। লোভনীয় অর্থ তুলে দেওয়া হয় ওদের হাতে।

আবার অনেকেই স্কুল-কলেজপড়ুয়া বন্ধদের সংস্পর্শে এসে নিজেদের মাদক সেবনের খরচ জোগাতেও এ চক্রভুক্ত হয়। ক্রমশ এরা এ চক্রের স্থায়ী সদস্য হয়ে যায়। ফেসবুক, হোয়াটসআপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে মাদকের অর্ডার নিয়ে নিজেদের প্রতিনিধি মারফত তাদের হাতে পৌঁছে দেয়।

তবে এসব বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ কামাল আকন্দ বাংলানিউজকে বলেন, ময়মনসিংহে মাদককেন্দ্রিক কিশোর গ্যাং’র কোনো অস্তিত্ব নেই। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এখানে যাতে কোনো গ্যাং কালচার বিকশিত হতে না পারে সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিয়েছি।

ময়মনসিংহের একটি সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মো. মফিজুল ইসলাম পাঠান বাংলানিউজকে বলেন, এলাকায় এলাকায় হিরোইজম দেখাতে অনেক সময় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গ্যাংয়ে সম্পৃক্ত হচ্ছে।

পরিবারের উদাসীনতায় পাড়া-মহল্লা কেন্দ্রিক মাদক ব্যবসার সঙ্গে এরা জড়িয়ে পড়ছে। এসব প্রবণতা বন্ধে কিশোর-তরুণদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও গঠনমূলক কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। খেলার মাঠ বাড়াতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ জেলার সাধারণ সম্পাদক আলী ইউসুফ কিশোর অপরাধের নেপথ্যে অভিভাবকদের অসচেতনতা, আকাশ সংস্কৃতি, আর্থ সামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন এবং তথ্য-প্রযুক্তির সহজলভ্যতাকেই দায়ী করেন।

ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট নুরুল হক বাংলানিউজকে বলেন, প্রধানত সঙ্গদোষেই শিশু-কিশোররা বিপথগামী হয়ে উঠছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণেই কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা যেমন বাড়ছে তেমনি অনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা, অনলাইন প্রযুক্তির কুপ্রভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাও এজন্য অনেকাংশে দায়ী। শিশু-কিশোরদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রত্যেকের পরিবারের পাশাপাশি এলাকার মুরব্বিদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে হবে সরকার এবং রাষ্ট্রকে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ বাংলানিউজকে বলেন, ময়মনসিংহে ‘কিশোর গ্যাং’ বলে কোনো শব্দ নেই। ময়মনসিংহে কিশোর অপরাধ বলতে গেলে শুন্যের কোঠায় রয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে একজন সাব ইন্সপেক্টরের মাধ্যমে বিট পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে কিশোরদের আইন বিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে নানাভাবেই সচেতন করছেন আমাদের সদস্যরা।

ডিআইজি আরও বলেন, দেশকে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে মাদকমুক্ত করতে আইজিপি মহোদয় নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই টার্গেট নিয়েই আমরা কাজ করছি। আমাদের চারটি জেলায় মাদক নির্মূলে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের এ যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। ’

Source Link 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here