ধর্ষণ-প্রতিরোধ এখনই

‘ধর্ষণ’ এক ধরনের যৌন আক্রমণ। সাধারণত, একজন ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম বা অন্য কোনো ধরনের যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে ধর্ষণ বলা হয়। ধর্ষণ শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্যভাবে চাপ প্রদান কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে। অনুমতি প্রদানে অক্ষম (যেমন- কোনো অজ্ঞান, বিকলাঙ্গ, মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি) এরকম কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণের আওতাভুক্ত। ধর্ষণ শব্দটির প্রতিশব্দ হিসেবে কখনো কখনো ‘যৌন আক্রমণ’ শব্দগুচ্ছটিও ব্যবহৃত হয়। উইকিপিডিয়া অনুযায়ী এটাই ধর্ষণের সংজ্ঞা।

ধর্ষণের সংজ্ঞা যাইহোক বর্তমানে বাংলাদেশে এর বিস্তার একেবারে মহামারির আকার ধারণ করেছে। সমাজের সকল স্তরে ধর্ষণ ছড়িয়ে পড়েছে। একেবারে চার বছরের শিশু থেকে শুরু করে আবাল-বৃদ্ধা-বনিতা কেউই ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ধর্ষণের কোন নির্দিষ্ট স্থান নেই। আসলে কোন জায়গায় আর এখন ধর্ষণকারীদের কবলমুক্ত নয়। ধর্ষণের কোন উপযুক্ত শাস্তি না হওয়ায় ধর্ষণ দিনেদিনে বেড়েই চলেছে। গণমাধ্যমে যে পরিমাণ ধর্ষণের খবর আসছে সেটাই আশংকার যদিও প্রকৃত সংখ্যাটা এর চাইতে অনেক বেশি। অনেকেই মান সম্মানের কথা ভেবে ধর্ষণের কথা প্রকাশ করেন না বা ধর্ষণকারীর বিরুদ্ধে মামলা করেন না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র কোথাও আর এখন মেয়েরা নিরাপদ নয়।

 

ধর্ষণকামী মানসিকতার জন্ম কোথায় সেটা আমার জানা নেই কিন্তু এর বিস্তার এখন জনমনে রীতিমত আতংক তৈরি করেছে। গ্রামের অখ্যাত মেয়েটা থেকে শুরু করে মিডিয়া স্টার সকলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ধর্ষণের স্বীকার। জনপরিবহনে মেয়েরা অনেক আগে থেকেই নিপীড়িত কিন্তু সেটা শুধুমাত্র যৌনাচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলও কিন্তু বর্তমানে সেটা ধর্ষণের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আর মামলার হাত থেকে বাঁচতে ভিকটিমকে মেরে ফেলা হচ্ছে খুবই বীভৎসভাবে যাতে কেউ সাক্ষ্য দিতে না পারে। কাউকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে তো কারো মুখটা থেঁতলে দেয়া হচ্ছে। পুলিশ অনেককেই আটক করছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই কোন না কোনভাবে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে।

এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ বাছাইপর্বে গ্রুপ পর্যায়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন দলের কলসিন্দুরের মেয়েরা যখন লোকাল বাসে করে ময়মনসিংহে তাঁদের বাড়ি ফিরছিলো তখন তাঁদেরকে উত্ত্যক্ত করা হয়। ঈদের ছুটি কাটাতে মঙ্গলবার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি লোকাল বাসে করে বাড়ির দিকে রওনা দেয় দলে থাকা কলসিন্দুরের মেয়েরা। তাঁদের সঙ্গে ছিল না বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কেউ বা কোনো অভিভাবক। বাসে অশ্লীল কটূক্তির শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন মার্জিয়া-নাজমা-তাসলিমারা। ফুটবলারদের একজন বলে, ‘বাসে বসা কয়েকজন বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করে আমাদের। যা নিয়ে তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়েছিলো কিন্তু সেই কোন সুরাহা করা হয়নি। এটা বাংলাদেশের গণপরিবহণে হেনস্তার চলাচল করা মেয়েদের দৈনন্দিনের চিত্র। আমরা কেন জানি মেয়েদের এগিয়ে যাওয়াটাকে সহজভাবে নিতে পারি না এবং হীনমন্যতায় ভুগি। আর সুযোগ পেলেই মেয়েদেরকে নিয়ে কটূক্তি করি।

আর ইদানীংকালে মেয়েরা সবচেয়ে বেশি উত্যক্ততার স্বীকার অনলাইনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একেবারে সাধারণ মেয়ে থেকে শুরু করে মিডিয়া স্টার সবাইকেই কটূক্তি শুনতে হয়। সেই কটূক্তির ভাষা এতোটাই জঘন্য যে সেটা একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মনেও প্রভাব ফেলবে। অনলাইন একটা খোলা প্লাটফর্ম তাই এখানে যে কেউই যেকোনো ধরণের মন্তব্য করার সুযোগ পায়। আর সেটাকে কাজে লাগিয়েই এক শ্রেণীর মানুষ তাঁদের মনের যৌনলিপ্সাকে চরিতার্থ করে। এইসব মানুষদের কথা পড়লে মনেহয় বাস্তব জীবনে তারা যেকোন ধরণের অপকর্ম করতে সিদ্ধহস্ত। এখন দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আছে কিন্তু সেটা দিয়েতো মানুষের মানসিকতা বদলে দেয়া সম্ভব নয়। মানসিকতার পরিবর্তন জরুরী।

কোন মেয়ে ধর্ষণের স্বীকার হলে শুরুতেই তার পোশাক কেমন ছিলো সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় যেটা একেবারেই অবান্তরই শুধু নয় বরং পুরুষের নিচু মানসিকতাকে ধামাচাপা দেয়ার একটা চেষ্টা। যেসব মেয়ে ধর্ষণের স্বীকার হয়েছে তাদের বয়স এবং পরিবেশ বিবেচনা করলে দেখা যায় পোশাক কোনভাবেই এই ঘটনার প্রভাবক নয়। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হচ্ছে অনেক মেয়েও ছেলেদের এই পোশাক থিউরির সাথে কণ্ঠ মেলায়। মেয়েরা কোন পোশাক পরবে সেটার স্বাধীনতা তাঁদের আছে। আমি আপনি কোন দৃষ্টিতে তাদের দেখবো সেটা একান্তই আমার আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

ধর্ষণের প্রতিরোধ এখনই করতে হবে যাতে আর একটা মেয়েও ধর্ষণের স্বীকার না হয়। সেটা করতে গেলে আইন তৈরি করার চেয়ে জরুরী মানসিকতার পরিবর্তন। ছোটবেলা থেকেই ছেলেদেরকে শেখাতে হবে কিভাবে মেয়েদেরকে সম্মান করতে হয়। এটা ছেলেদের কাজ সেটা মেয়েদের কাজ এই মানসিকতা পরিহারের শিক্ষা তাদেরকে দিতে হবে ছোটবেলা থেকেই। ঘর গৃহস্থালির কাজে মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদেরকেও যুক্ত করতে হবে তাহলে ছেলেরাও বুঝবে মেয়েদের, মায়েদের কাজগুলোও মোটেও সহজ নয়। এছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এই শিক্ষাটা দেয়া জরুরী। সামাজিকভাবেও ছেলেদেরকে শিক্ষা দিতে হবে যেন পথে ঘাটে তারা মেয়েদেরকে খাটো করে না দেখে। মেয়েদেরকে ছোট করে দেখার মানসিকতাও ধর্ষণের জন্য অনেকখানি দায়ী।

ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ হতে হবে সমাজের সর্বস্তর থেকে। সরকার শুধু আইন করে এবং সেটার প্রয়োগ করে ধর্ষণ বন্ধ করতে পারবে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পত্রিকা সর্বোপরি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হবে। সাধারণত দেখা যায় একটা ধর্ষণের খবর প্রকাশ হলে সবাই সরব হয়ে যায় আবার দু একদিন পরেই অন্য একটা বিষয় নিয়ে মেতে উঠেন কিন্তু যে ধরণের স্বীকার হন তিনি আর কখনওই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন না। ধর্ষণের প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রেও এক ধরণের অনীহা চোখে পরে। সবাই ফেসবুকে যেটুকুবা প্রতিবাদ করেন কেউই আর রাস্তায় নামতে চান না। কোভিডের এই সময়ে যেহেতু রাস্তায় সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ ছিলো অন্ততপক্ষে ঘরে বসে ধর্ষণবিরোধী প্ল্যাকার্ড ধরে ছবি তুলে নিজ নিজ প্রোফাইলে দিলে সেটাও এক ধরণের প্রতিবাদ হতো কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো সবাই শুধু কথায় কথায় প্রতিবাদ করছেন কিন্তু কেউই নিজেদেরকে সামনে আনতে চাইছেন না।

সম্প্রতি একদল প্রতিবাদকারী কুমিল্লায় ধর্ষণের স্বীকার মহিলার সাথে দেখা করতে যাওয়ার পথে বাসের মধ্যেই মার খেয়েছেন। তাই ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড সহ আইন পাশ হলেও তার প্রয়োগ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। আর ধর্ষণের বিচারিক প্রক্রিয়াটা এবং তার দীর্ঘসূত্রিতা ধর্ষণের স্বীকার পরিবার মামলা করা থেকে নিজেদের বিরত রাখেন। কুমিল্লার ঘটনাটা আমি আমার দশ বছর বয়সী মেয়েকে বলেছিলাম এবং আমরা দুজন দুটো ধর্ষনবিরোধী প্ল্যাকার্ড নিয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়েছিলাম। অনেক লাইক এবং কমেন্ট পেয়েছিলাম কিন্তু কেউই আমাদের অনুসরণ করে আর এগিয়ে আসেনি। তখন বুঝলাম আমাদের প্রতিবাদ শুধু মুখে মুখেই যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা নিজেরা আক্রান্ত হচ্ছি।

1605079194 702 ধর্ষণ প্রতিরোধ এখনইবর্তমানে বাংলাদেশের ধর্ষণ একটা সামাজিক ব্যাধির রূপ নিয়েছে এবং মহামারীর আকারে ছড়িয়ে পড়ছে তাই সর্বাত্মক প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ এখনই নিতে হবে। বাংলাদেশের একসময় এসিড সন্ত্রাস সামাজিক ব্যাধির রূপ নিয়েছিলো। এরপর সবার সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সেটা থামানো গেছে। আমি ভীষণ আশাবাদী আমরা সবাই একতাবদ্ধভাবে এগিয়ে আসলে ধর্ষণকেও সমাজ থেকে নির্মূল করা সম্ভব। আসুন আমরা প্রত্যেকে তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে করনীয়টুকু করি যাতে করে আর একটা মেয়েও ধর্ষণের স্বীকার না হন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Source link

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here