এম এন লারমার সংগ্রাম শেষ হয়নি


১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এম এন লারমার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, যার পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয় পাহাড়ের ১১টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী। পঁচাত্তরের পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান হাজার হাজার বাঙালিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে সেখানকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করেন। বহু বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব বাঙালি ছিলেন, পাহাড়িদের সঙ্গে তাঁরা মিলেমিশেই বসবাস করছিলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান যাঁদের পাঠালেন, তাঁদের একাংশ জবরদখল শুরু করেন।

বাংলাদেশ সংবিধান পাহাড়িদের পৃথক জাতিসত্তার কথা স্বীকার করেনি। এ নিয়ে এম এন লারমার মনে ক্ষোভ ছিল। তারপরও তিনি ভেবেছিলেন গণতান্ত্রিক উপায়ে পাহাড়িদের পক্ষে লড়াই করবেন। এই বিবেচনায় তিনি বাকশালেও যোগ দেন। কিন্তু পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এম এন লারমা ও তাঁর সহযোগীরা আত্মগোপনে চলে যান। গড়ে তোলেন শান্তি বাহিনী—জনসংহতির সশস্ত্র শাখা।
পরের ইতিহাস সবার জানা। কর্ণফুলীর স্রোতে মিশে গেছে অসংখ্য পাহাড়ি ও বাঙালির রক্ত। রাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্তে রক্তাক্ত হয়েছে পাহাড়ের সবুজ ভূমি, চিরকাল পাশাপাশি বাস করা পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যকার সম্প্রীতির বন্ধন টুটে যায়। বেড়ে যায় হিংসা ও হানাহানি। কোনো জাতিগোষ্ঠীর ক্ষতি শুধু সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে অপূরণীয় বেদনা, অপরিসীম কষ্ট ও হাহাকার।

অন্যান্য আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টিতে যেমন অন্তর্দলীয় বিরোধ দেখা দেয়, জনসংহতি সমিতিও তার ব্যতিক্রম ছিল না। একদিকে এম এন লারমা গ্রুপ, অন্যদিকে প্রীতি গ্রুপ। শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ গ্রুপের হাতে জীবন দিতে হয় এম এন লারমাকে, ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর।

কিন্তু তাঁর সংগ্রাম ও সাধনা বৃথা যায়নি। যে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি লড়াই করেছিলেন, তাদের কিছুটা হলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলেছে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার পাহাড়িদের দাবি স্বীকার করে নিয়ে সই করে পার্বত্য চুক্তি, যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু সেই চুক্তির অনেক ধারাই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে পাহাড়িদের ভূমি সমস্যার সমাধান হয়নি। পার্বত্য চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেই বলা যাবে এম এন লারমার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ সার্থক হয়েছে।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি



Source link

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here